সারাদেশ

হত্যা মামলার এজাহারনামীয় আসামি হয়েও বহাল শিল্প পুলিশের খুলনা জেলার এসপি আনসার উদ্দিন, দুদকে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগ

ছাত্র আন্দোলনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে হত্যা মামলার এজার নামীয় আসামিসহ একের পর এক অভিযোগের পরও বহাল রয়েছেন পুলিশ সুপার আনসার উদ্দিন। শিল্প পুলিশের খুলনা জেলার এই এসপির নামে এবার অর্থ কেলেঙ্কারিসহ বিভিন্ন অনিয়মে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ জমা পরেছে। অভিযোগ গ্রহণের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রক্রিয়াও শুরু করেছে দুদক। 

দুদকে করা ওই অভিযোগ পত্রে বলা হয়েছে, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর যাত্রাবাড়ি থানায় দায়েরকৃত একটি হত্যা মামলার এজাহারনামীয় আসামি এসপি আনসার উদ্দিনের। গত বছরের সেপ্টেম্বরে রাজধানীর যাত্রাবাড়ি থানায় ৩০২/২০১/৩৪ ধারায় দায়ের করা ২২ নাম্বার মামলার ১৭ নাম্বার আসামি তিনি। ওই মামলার সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি ছাড়াও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ আরো ৮৭ জন আসামি করা হয়েছে। এরপরও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তিনি যেই মুক্তিযোদ্ধার কোটাতে চাকরি পেয়েছেন সেই মুক্তিযোদ্ধার সনদও ভুয়া। তিনি নিজ এলাকায় যেই অট্টালিকা তৈরি করেছেন, তা তার সারাজীবনের চাকরির অর্জিত অর্থ দিয়েও সম্ভব নয়। ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত টাকা দিয়েই এসব নির্মাণ করেছেন তিনি। শুধু তাই নয়, দুর্নীতির তার নিজের বাড়ি ঢোকার জন্য ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি টাকা খরচ করে তৈরি করেছেন কালভার্ট। ফ্যাসিস্ট সরকারের রাতের ভোটের ম্যাকানিজম করেও তিনি বিপুল টাকা হাতিয়েছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। মৃত আব্দুল খালেক ব্যাপারীর এই ছেলে এলাকায় শুভ নামে পরিচিত। 

ক্ষমতার অপব্যবহার ও তার অপকর্মের বিচার চেয়ে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গত ১৮ই আগস্ট স্বরাষ্ট্র সচিবের কাছে আবেদন করেছেন বরিশাল জেলার মুলাদী উপজেলার কায়েতমারা গ্রামের ভুক্তভোগী আলাউদ্দিন ব্যাপারী। আরেক ভুক্তভোগী আকতার ব্যাপারীর দাবি, এসপি আনসার উদ্দিন অন্যের জায়গা দখল করে পুলিশ পাহারায় বাড়ি তৈরি করেছেন। অথচ তিনি মাত্র প্রায় ১৭ শতাংশ জায়গা কিনেছেন। আর বাড়ি করেছেন এর প্রায় দ্বিগুণ জায়গার ওপর। উপরন্তু যে দাগে তিনি জমি কিনেছেন সেই দাগে বাড়ি না করে এসপি আনসার উদ্দিন সুবিধাজনক অন্য দাগে বাড়ি করেছেন। বাড়ি করার সময় স্থানীয় থানার পুলিশ ছাড়াও তার লোকজন উপস্থিত ছিলেন। এ নিয়ে এলাকায় ব্যাপক সমালোচনা আছে। মানুষ পুলিশের ভয়ে প্রতিবাদ পর্যন্ত করতে পারেনি। যদিও পরে মানব বন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালিত হয়েছে। বিগত সরকারের আমলে তাদের ছাড়াও যারাই তার বিপক্ষে গেছে, তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করেছেন। এমনকি নারী নির্যাতনের মামলা দিয়েও হয়রানি করা হয়েছে। 
ভুক্তভোগীদের দাবি, এসপি আনসার উদ্দিন টুরিস্ট পুলিশের কুয়াকাটা জোনে কর্মরত ছিলেন। ওই সময় কুয়াকাটা ও বরিশালের মুলাদী এলাকার এসপি আনসার উদ্দিনের নাম শুনলেই সবাই ভয় পেতো। নিজ এলাকায় গড়ে তুলেছিলেন সন্ত্রাসী বাহিনী। বাহিনীটি এসপি আনসার উদ্দিনের ছত্রছায়ায় ওই এলাকার মাদক ও জমিসহ নানা অপকর্মে জড়িত ছিল।  

স্থানীয়দের অভিযোগ, যশোরের অতিরিক্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসাবে কর্মরত থাকার সময় তিনি ওই এলাকার ইট ভাটা মালিকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে নানা সুবিধা নিয়েছেন। যার মধ্যে আছে বিনামূল্যে বাল্কহেড ভর্তি করে নদী পথে ইট নিয়েছেন। সেই ইট দিয়ে স্থানীয় সুলতান ব্যাপারী নামের এক ব্যক্তির জমি জোরপূর্বক দখল করে সেখানে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে বাড়ি নির্মাণ করেছেন। ইটভাটার মালিকদের ইটের অর্ধেক দাম দেয়ার কথা থাকলেও, তাও দেননি এই পুলিশ কর্মকর্তা। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশে কর্মরত থাকার সময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরির প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার আসামিদের মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সুবিধা দেয়ার অভিযোগ আছে এই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এছাড়াও হাসিনা সরকারের সময় অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. জহির উদ্দিন খসরুর পক্ষেও নির্বাচনি প্রচারণার অংশ নেয়ার অবিযোগ রয়েছে এই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। তার সঙ্গে বরিশাল-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম কিবরীয়া টিপুরও সখ্যতা ছিল। পিতা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি হওয়ায় ছাত্র জীবনেও তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ রাজনীতিরও সঙ্গে জড়িত ছিলেন। 

তবে এ সব অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে এসপি আনসার উদ্দিন বলেছেন, তিনি কারো জমি দখল করেননি। তিনি ১২ শতাংশ জমি কিনে বাড়ি করেছেন। তবে এক দাগে জমি কিনে অন্য দাগে ভোগদখলের বিষয়ে স্পষ্ট করে তিনি কিছুই বলেননি। আর এলাকায় তার নিজস্ব কোন বাহিনী নেই। তিনি কাউকে কখনো মিথ্যা মামলা দিয়েও হয়রানি করেননি। আর তার পিতা শুধু মুক্তিযোদ্ধাই ছিলেন না, ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কমান্ডার। একজন ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন তিনি। যাত্রাবাড়ি থানায় দায়েরকৃত মামলার বিষয়ে তিনি বলেন,  হ্যা একটা মামলা হয়েছিল, তবে সেটা স্থানীয় কিছু লোক ঈশ্বার্নিত হয়ে তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করেছে। পুলিশ এসব বিষয়ে তদন্ত করেছে, কিছু পাইনি। এখন তারা হতাশ হয়ে হয়তো দুদকে অভিযোগ করেছে। দুদকও তদন্ত করলে কিছুই পাবে না।  

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button